মোদি আমলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত: সোনিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের গত ১২ বছরের শাসনামলে দেশ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিরোধীদের নির্বাচনে সমান সুযোগ না দেওয়া এবং ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে মোদি সরকার।

সম্প্রতি ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ৭৯ বছর বয়সি সোনিয়া গান্ধী। আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তাঁর স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’।

ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের একসময়কার আধিপত্য কমে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সোনিয়া বলেন, এ নিয়ে তিনি খুব বেশি হতাশ নন। তাঁর মতে, গত ১২ বছরে দেশের গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

সোনিয়া গান্ধী বলেন, সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় প্রয়োজন হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবে দেশের মানুষ এখন ক্ষতির বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের রাজনীতি আবারও নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর বিশ্বাস, দেশের মানুষ আবারও সুশাসন ফিরে আসাকে স্বাগত জানাবেন।

এদিকে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট কারচুপি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে তারা।

সোনিয়ার বক্তব্যের জবাব বিজেপির

সোনিয়া গান্ধীর গণতন্ত্র নিয়ে মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। তিনি কংগ্রেস নেত্রীকে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ওই সময় গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজারো জ্যেষ্ঠ নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল এবং সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল।

মেঘওয়ালের দাবি, গত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই ভারত বিশ্বজুড়ে ‘গণতন্ত্রের জননী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংও সোনিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একসময় জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের কণ্ঠরোধ করেছিল কংগ্রেস। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে দলটি ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জরুরি অবস্থা নিয়ে সোনিয়ার ব্যাখ্যা

সাক্ষাৎকারে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পটভূমি নিয়েও কথা বলেন সোনিয়া গান্ধী। তাঁর ভাষ্য, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সে সময় বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ, সরকারি কার্যালয় ও গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি কর্মকর্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ অমান্যের আহ্বান জানানো হচ্ছিল।

তবে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের পক্ষে সরাসরি সাফাই না দিয়ে সোনিয়া বলেন, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিস্থিতির সমাধান হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালের মার্চে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং জরুরি অবস্থার সময় অতিরিক্ত কঠোরতার জন্য পরে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সোনিয়া আরও বলেন, রাজনীতিতে কখনো কখনো সমঝোতা করতে হয়। তবে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে কংগ্রেস কখনো সমঝোতা করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

নির্বাচনে সমান সুযোগ পাচ্ছে না বিরোধীরা: সোনিয়া

২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরপর তিনবার বড় পরাজয়ের পরও কংগ্রেস এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে সমান সুযোগ পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কমিশন, মূলধারার গণমাধ্যম, বিপুল অর্থের ব্যবহার এবং ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কংগ্রেস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। সোনিয়ার ভাষ্য, নানা ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েও দলটির নেতা-কর্মীরা দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও জেলায় সংবিধানের মূল্যবোধ রক্ষায় কাজ করছেন।

তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এসেছে এবং মানুষ এখন এ বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন। একই মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কংগ্রেস কাজ করছে এবং দলটির নির্বাচনী সম্ভাবনা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

মোদির রাজনৈতিক উত্থান নিয়েও মন্তব্য

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থান নিয়েও কথা বলেন সোনিয়া গান্ধী। চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গল্প তাঁর প্রচার দল কিছুটা বাড়িয়ে প্রচার করেছে কি না, এমন প্রশ্নে সোনিয়া বলেন, সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে মোদিকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।

তবে তিনি বলেন, রাজনীতিতে সফল হওয়ার অনেক পথ রয়েছে। কংগ্রেসের মধ্যেও ড. মনমোহন সিং ও দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের মতো উদাহরণ রয়েছে। আরএসএসের কাছ থেকে কংগ্রেসের শেখার মতো তেমন কিছু আছে বলে তিনি মনে করেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *