যশোরে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা ঝরছে প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যশোরের বিভিন্ন এলাকায় অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। কোথাও গেটম্যান নেই, কোথাও নেই ব্যারিয়ার। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর লেখাও অস্পষ্ট। ফলে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সর্বশেষ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গাজীরদরগাহ ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন একটি অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়ভাবে তৈরি ওই ক্রসিং দিয়ে জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে যাওয়ার পথে বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা বেতনা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় একটি কাভার্ডভ্যান দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে চালক আতিয়ার রহমান (৫৫) গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ঝিকরগাছার কাটাখাল কলোনিপাড়ার বাসিন্দা।

এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় একটি ইজিবাইককে ধাক্কা দেয় ট্রেন। এতে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী নিহত হন। শুধু সাম্প্রতিক এই দুটি ঘটনাই নয়, গত এক দশকে এ অঞ্চলের অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে অন্তত অর্ধশত দুর্ঘটনায় ৮০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ১০১টি অনুমোদনহীন। আর অনুমোদিত ৮২টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৮টিতে কোনো গেটম্যান নেই।

রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণের কারণে অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভারও দায় রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রেলওয়ের হিসাবের বাইরেও বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনেই এসব পথ তৈরি করেছেন। ফলে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এসব ক্রসিং দিয়ে চলাচল করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকেরা। কোথাও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অনেকগুলোর লেখা অস্পষ্ট ও জরাজীর্ণ। গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার সময় নিজ দায়িত্বে সতর্ক হয়ে রেললাইন পার হতে হচ্ছে মানুষকে।

যশোর-বেনাপোল রেললাইনে মোট ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছাড়া বাকি ২৪টিতে গেটবার নেই। অন্যদিকে যশোর-কোটচাঁদপুর রুটের খড়কি এলাকায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে সাতটি লেভেল ক্রসিং। এর মধ্যে খড়কি ধোপাপাড়ার সড়কটি যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের বহু মানুষের শহরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই সড়কের ওপর দিয়ে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। কিন্তু সেখানে নেই কোনো গেটম্যান। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও তার লেখা অস্পষ্ট ও নাজুক। ঝুঁকি নিয়েই মানুষকে রেললাইন পার হতে হচ্ছে।

খড়কি এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন পলাশ বলেন, এলাকাটি অত্যন্ত জনবহুল। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনেই এখানে লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেখানে গেটম্যান কিংবা ব্যারিয়ার নেই। মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে তিনি রেল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাহেব আলী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংয়ের ওপারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিদিন শিশুরা এই ক্রসিং পার হয়ে স্কুলে যায়। ট্রেনের শব্দ শুনে স্থানীয়রা সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, শিশুদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সেখানে গেটম্যান নিয়োগ জরুরি।

এদিকে যশোর-বেনাপোল রেললাইনের খড়কি এলাকার অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে কিছু দূর এগোলেই মহাসড়কের ওপর একটি অনুমোদিত রেলক্রসিং রয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী দুই গেটম্যান জানান, মহাসড়কের এই ক্রসিংটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁরা নির্ধারিত সময়ে ব্যারিয়ার নামিয়ে দিলেও অনেক পথচারী নিয়ম মানতে চান না। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এতে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকেন তাঁরা।

বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, অনুমোদিত রেলক্রসিংয়ের পাশাপাশি স্থানীয় প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য ক্রসিং তৈরি হয়েছে। রেলওয়ে এসব ক্রসিংয়ের অনুমোদন না দেওয়ায় অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এসব ক্রসিং এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিরাপদ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের যশোর অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা সরকারি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন রেলক্রসিং তৈরি করেছে। এসব ক্রসিংয়ের দুই পাশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রসিংয়ের বৈধতা চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, কেউ যাতে নতুন করে অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত রেললাইন পরিদর্শন করা হয়। কেউ এমন ক্রসিং তৈরির চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার কাজও চলছে।

তবে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় যশোরের অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *